মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

উন্নত বীজ,সার ও কীটনাশক

উচ্চফলনশীল বীজ, সেচ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে কৃষিবিদ নরমান বোরলগ কৃষিব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সবুজ বিপ্লব হিসেবে পরিচিতি পায়। সবুজ বিপ্লব উত্পাদন বাড়ালেও পরিবেশের প্রতি যে অবিচার করেছে, তার জন্যও সমানভাবে সমালোচিত হয়েছে। ফলে উন্নত বিশ্বে এক দশক ধরে পরিবেশকে বাঁচিয়ে কীভাবে কৃষি উত্পাদন বাড়ানো যায়, তার গবেষণা শুরু হয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তি আসার সূত্র ধরে এরই মধ্যে গোটা বিশ্বে ঝড় তুলেছে কৃষির এ নতুন আবিষ্কার। এ প্রযুক্তিতে শোধন করা পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করলে পণ্যের উত্পাদন ২৫-৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে পরীক্ষামূকভাবে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার না হলেও উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি ভারত, চীন, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ইরান ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। কারণ কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বীজ, সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভর করে সবুজ বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। তবে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
ন্যানো প্রযুক্তিতে পানি শোধন সম্পর্কে এক কৃষি বিশেষজ্ঞ জানান, ডিভাইসটি সাধারণত সিরামিকের দুটি ধাতব স্তর দিয়ে তৈরি। দুই স্তরবিশিষ্ট এ ধাতব টিউবের নাম অ্যাটম সিরামিক। এর মধ্য দিয়ে বাহিত পানি কয়েকটি ধাপে ঘূর্ণায়মান হয়। এ পানি কসমিক ওয়েভ ছাড়া অন্য কোনো শক্তি গ্রহণ করে না। কসমিক ওয়েভ পানিতে নেগেটিভ আয়নের পরিমাণ ৪-৫ গুণ বাড়িয়ে দেয়। নেগেটিভ আয়নসমৃদ্ধ পানি পণ্যের ভেতরে ঢুকে ফ্রি র্যাডিক্যাল নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এতে পণ্যের সতেজতা ও উত্পাদন বাড়ে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়াইস কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, পানি শোধন প্রক্রিয়ায় পণ্যের উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব। প্রাথমিকভাবে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে ধান উত্পাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশে এখনো ন্যানো প্রযুক্তির কোনো ব্যবহার নেই।
পানি শোধনের মাধ্যমে পণ্যের উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব, এমন মন্তব্য করেছেন বিএআরসির সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার এএ হাসান। তিনি বলেন, ন্যানো প্রযুক্তিসম্পন্ন শোধন যন্ত্র ছোট কৃষি খামারে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। সফল হলে পরবর্তী সময়ে আরও বৃহৎ আকারে এর ব্যবহার হতে পারে।
গ্লোবাল এগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ১ কোটি ১৭ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে চাল উত্পাদন হয় ৩ কোটি ৪০ লাখ টন। ৪ লাখ হেক্টর জমিতে উত্পাদিত গমের পরিমাণ ১১ লাখ টন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সমপরিমাণ এ জমিতে পানি শোধনে ন্যানো ডিভাইস ব্যবহার করলে চালের বর্তমান উত্পাদন বাড়িয়ে সোয়া ৪ কোটি টনে উন্নীত করা সম্ভব।
জানা গেছে, বাণিজ্যিকভাবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি বাজারজাতের চেষ্টা করছে। এমনই একটি প্রযুক্তিপণ্যের নাম ডিলেকা। বিশ্বে ১৬টি দেশে যন্ত্রটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। পণ্যটির উদ্ভাবক অধ্যাপক কিকুয়া তামুরা।
জাপানে উদ্ভাবিত পানি শোধনের এ যন্ত্র দেশে আনছে তামুরা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক স্যাম শাহেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাপানে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে এ পণ্যের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করছি বাংলাদেশে কৃষিকাজে বাণিজ্যিকভাবে পণ্যটির ব্যবহার নিয়ে কাজ করতে। এ কারণে প্রাথমিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে এর বিপণন শুরু করব। আমরা পণ্যটির বাণিজ্যিক বিপণন শুরু করার আগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কাছ থেকে পরীক্ষা করিয়ে এটি বিপণনের অনুমোদন নেব।’
তবে শুধু জাপানই নয়, ভারতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে ন্যানো প্রযুক্তির ডিভাইস বাজারজাতকরণের চেষ্টা করছে। ভারতের টাটা এরই মধ্যে পানি শোধনের ন্যানো ডিভাইস আবিষ্কার করেছে। ভারতের কিছু অঞ্চলে পাইলট প্রকল্পে এ প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক ব্যবহার হচ্ছে। পিছিয়ে নেই থাইল্যান্ডও। কিছুদিন আগেই থাইল্যান্ডে হয়ে গেল এ-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন। তারাও কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর ন্যানো ডিভাইস ব্যবহার করছে।
দেশে ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার সবসময়ই ইতিবাচক। তবে নতুন এ প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের আগে সরকারের বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। কেননা উন্নত দেশগুলোর ব্যবহূত সব প্রযুক্তি দেশের কৃষি উত্পাদনের জন্য টেকসই নয়। বিশেষ করে ন্যানোর মতো কৃষিপ্রযুক্তি দেশের আবহাওয়া ও মাটির জন্য টেকসই কি না, তা যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। এর আগেও অধিক উত্পাদনের কথা বলে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি আনা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো দেশের কৃষির জন্য ইতিবাচক না হয়ে ক্ষতিকর হয়ে দেখা দিয়েছে। এমনকি ভূ-পরিবেশেরও ক্ষতি করছে। তাই ন্যানোর বিষয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


Share with :

Facebook Twitter